Story

গন্তব্যহীন

রাত একটা বাজে। এলোমেলো পায়ে হেঁটে চলেছি। কোথায় যাচ্ছি জানা নেই। নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যই নেই আসলে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ব্যস্ত শহরটাকে কেমন যেন অচেনা আর জাদুকরী মনে হচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ পুরো বেগে শাঁই করে একটা-দুটো গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। ফাঁকা রাস্তাটাকে নিজের মালিকানায় নিয়েছে যেন!
গা হিম করা বাতাসটায় মাঝেমধ্যেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে। কাঁধের একপাশে ফেলে রাখা চাদরটাকে আরও ভালো করে শরীরে জড়িয়ে নিলাম। একটা টং পেলে ভালো হতো। কড়া লিকারের এক কাপ আদা চা এই আবহাওয়ার সাথে ভীষণ যায়! তবে সেটা না পাওয়ায় আপাতত পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। এক টান দিতেই বোধ হলো, চায়ের চেয়ে এটার স্বাদ একটুও মন্দ না। বরং নিকোটিনই মনে হচ্ছে বেশি দরকার ছিলো আমার!

সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। শরীরে আর জোর পাচ্ছি না বিধায় ফুটপাতের উপর শুয়ে থাকা কুকুরটার পাশে বসে পড়লাম। কুকুরটাকে দেখে নিজের অবস্হার কথা মনে হলো। আর তাতে অজান্তেই একটু হেসে ফেললাম। প্রাণীটার সাথে আমার শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্য ছাড়া তেমন কোনো পার্থক্যই নেই। কিছুদিন পর হয়তো আমার চিরস্হায়ী থাকার স্হান এই কুকুরের পাশেই হবে।

বাংলায় স্নাতকোত্তর শেষ করে বেকার বসে আছি দুই বছর হলো। আমার বাবা একজন স্বল্প বেতনের সরকারি কর্মকর্তা। মা গৃহিণী। আমাদের চার ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ দিয়ে, সংসারের কাজে ব্যয় করে, মাসের শেষে সঞ্চয়ের জন্যে বাবার হাতে কোনো টাকাই থাকে না। পরিবারের বড় ছেলে আমি। তাই স্বাভাবিকভাবেই অদৃশ্য দায়িত্বের বোঝাটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ঘাড়ে চেপেছিল। এত বড় হয়েও সংসারের করুণ অবস্হায় হাত খরচ চাইতে লজ্জা হতো। এমনিতেই পড়াশোনা করাতে যেয়ে বাবার কম টাকা খরচ হচ্ছিলো না। আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্যে টাকার পরিমাণটা আসলেই বেশি! চা, সিগারেটের জন্যেও টাকা পাচ্ছিলাম না বিধায় বাধ্য হয়ে টিউশনি খোঁজা শুরু করলাম।
বাংলায় স্নাতকে পড়ুয়া এক ছেলের জন্য প্রতিযোগিতার এই যুগে টিউশনি পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব বলা চলে। তাও এক কাছের বন্ধুর বদৌলতে টিউশনি পেয়ে গেলাম। দুই ভাইবোন। একজন ক্লাস টুতে, আরেকজন ফোরে। মাসিক বেতন আড়াই হাজার। যা আমার পনের দিনের সিগারেটেই শেষ হয়ে যায়। তাও কোনোভাবে চলছিলাম। পড়াশোনা করছি বলে বাবাও টাকা কামাইয়ের তাগাদা দিতো না। কষ্ট হলেও মলিন হাসি দিয়ে মাসের শেষে হাতে টাকা তুলে দিতে আসতো। সারাদিনের ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ দেখা যেতো তার চোখেমুখে। আমি গভীর নিঃশ্বাস ফেলে টাকাগুলো নিতাম।
ছাত্র ভালো ছিলাম না তেমন। মোটামুটি একটা ফলাফল নিয়ে মাস্টার্স শেষ করি। শুরু হয় চাকরি খোঁজার লড়াই। বাংলায় মাস্টার্স দেখে প্রথমেই চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতো অনেকখানি। তার উপর হাজার হাজার আধুনিক ছেলের ভিড়ে আমায় নগণ্য লাগতো। এছাড়া আমার কোনো প্রভাবশালী মামা,চাচাও নেই। সুতরাং, দুই বছরেও একটা চাকরি পাইনি। টিউশনির আড়াই হাজার টাকায় নিজেরই চলে না, সংসারে কী দিবো! মা এতদিন বাবার জন্যে কিছু বলতে পারতো না। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার পর বাবাই যখন বাধ্য হয়ে চাকরির কথা বললো, মা তার এতদিনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে আমায় কথা শোনাতে লাগলো। আসলেই তো, ভাইবোনগুলোর জন্যেও এতদিনে কিছুই করতে পারছি না। সংসারের বড় সন্তান হয়েও পড়াশোনা শেষ করে শুধুই বাবার অন্ন ধ্বংস করছি। অভিযোগগুলো চুপচাপ শুনে যাই। কিছু বলার থাকে না আসলে! তবে মাঝেমধ্যেই সহ্য না হলে অনর্থক চিৎকার-চেঁচামেচি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। যেমনটা আজ সকালে করেছি। আগে মা রাত হয়ে যাবার পরেও বাড়ি না ফিরলে বাবার মোবাইল থেকে কল দিতো আমায়। কান্নাকাটি করে অভিমান ভাঙিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করতো। কিন্তু দুইদিন যাবৎ সিগারেট কেনার টাকা ছিলো না বিধায় দুই বছরের পুরনো মোবাইলটা গতকাল বিক্রি করে দিয়েছি। মা সেটা জানে না। হয়তো ছেলের অভিমান ভেঙ্গে ঘরে ফেরাতে এখনও অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে সরল মা টা জেগে বসে আছে। এখনো হয়তো আমার বন্ধ নাম্বারটিতে অবিরত কল দিয়েই যাচ্ছে……!

পায়ে কীসের যেন এক নরম স্পর্শ অনুভূত হতেই সকল ভাবনা হতে অবসান নিলাম। কুকুরটা কখন যেন জেগে গিয়ে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি উঠে হাঁটা শুরু করলাম। কুকুরটা পেছন থেকে ডেকে উঠলো। যেন আমায় তার পাশেই চাইছে!

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!