মেঘের মানচিত্র-২
আমি সেই রাতে মায়ের কথা বিশ্বাস করলেও ধীরে ধীরে বুঝেছি কিছুই ঠিক হবে না। ঠিক হবারও নয়। মিথ্যে কিছু সান্ত্বনার বদলে সন্তানকে অভয় দেয়ার প্রয়াস ছিলো মাত্র! যা হয়তো তার মনেও সাময়িক বেঁচে থাকার আশ্বাস জাগাতো। সময় যত গড়াচ্ছিলো, বাবা আরও আসুরিক হয়ে উঠছিলেন। বাসায় এলেই মাকে মারধোর করতেন। আমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকতাম। মনে হতো ঘোর দুঃস্বপ্ন দেখছি। কিন্তু সেই দুঃস্বপ্ন বাস্তবতা হয়েই প্রতিভাসিত হতো রোজ। বাবা একদিন মায়ের চুল ধরে মারতে মারতে পুরো আধমরা করে ফেলেছিলেন। ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরছিলো। হাতের, গলার চামড়ায় রক্ত জমাট বেঁধে কালচে বেগুনি হয়ে গিয়েছিলো। মাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝের একপাশে ফেলে রেখে তিনি যখন বেরিয়ে গিয়েছিলো, আমি ধীর পায়ে মায়ের সামনে যেয়ে দাঁড়িয়ে হাতটা ধরে উঠানোর চেষ্টা করলাম। মা উঠতে গিয়েও পারলেন না। ওভাবেই বসে গেলেন। আমার দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করলেন। তখনই তার চোখ থেকে টপ করে চেপে রাখা জল গড়িয়ে পড়লো। মুছলেন না তিনি। হয়তো সে রাহিত্য ততদিনে ফুরিয়ে গিয়েছিলো।
মাঝরাতে কীসের যেন এক কম্পনে ঘুম ভেঙে যেতো আমার। মায়ের বুকের সাথে মিশে থাকা আমি বুঝতে পারতাম, মুখ চেপে ডুকরে কাঁদছেন তিনি। যদি সেই চাপা কান্না কখনও তিনি প্রকাশ করতে চাইতেন, তবে তা নিঃসন্দেহে তীব্র আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে আসতো। কয়েক ফোঁটা ষদুষ্ণ জল যখন আমার হাতে এসে পড়তো, শিউরে উঠতাম আমি। কতটা পীড়ন আর অসহায়ত্বের সে নয়ননীর, তা আমার চেয়ে ভালো আর কেইবা জানতো! খুব ইচ্ছে হতো, মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলি, “কেঁদো না মা। আমি আছি তো!” কিন্তু দ্বিধা আর সংকোচ আমায় কিছুই বলতে দিতো না শেষ অব্দি। নির্বাক হয়ে মরার মতো পড়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকতো না তখন। ভেবেই নিয়েছিলাম অদৃষ্টের এই নিষ্ঠুরতা আমার প্রতিদিনকার সঙ্গী। কিন্তু, ভাবতে পারিনি যে প্রকৃতি এরচেয়েও বড্ড বেশি অকরুণ। যা একটাসময় আমার জীবনীশক্তি বিরহিত করে নেবে! যাই হোক, সে কথায় পরে আসছি।
পড়াশোনা করছিলাম বেশ মনোযোগী হয়েই। মা আমায় প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন। বাবা ঠিকমতো পড়ালেখার খরচ দিতেন না। তখন মা কোথা থেকে যেন টাকা ধার করে একটা সেলাই মেশিন কিনলেন। ঘরে বসেই মানুষের জামা বানিয়ে দিতেন। তার বদলে পেতেন সামান্য পারিশ্রমিক। নিজের জন্যে কিছুই কেনার আগ্রহ ছিলো না। একটা মাটির ব্যাংকে পারলে কিছু টাকা জমাতেন, আর বাকি সব টাকাই আমার প্রয়োজন মেটানোর জন্য ব্যয় করতেন। তার পাহাড় সমান ক্লেশের এক বিন্দুও যেন আমার গায়ে না লাগে, সেটাই তার একমাত্র অভিপ্রায় ছিলো। কিন্তু অবুঝ মা কি বুঝতেন তার সেই ছোট্ট ছেলেটা শুধুই তার অশ্রুজল চিরতরে মুছাতে চাইতো? তার এই ছোট্ট জীবনের আশ্রয়স্থল তো একমাত্র সেই মানুষটিই ছিলেন। সেই শিকড়কে আঁকড়ে ধরেই তার বড় হওয়ার আকুতি তা হয়তো তিনি বুঝতেন না। আর বুঝতেন না বলেই জীবন্ত আমিকে আমৃত্যু অগ্নিশিখায় দগ্ধ করার জন্যে ফেলে রেখে যেতে পেরেছেন!
হসপিটাল থেকে বের হয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি বাস স্ট্যান্ডের মোড়ে। কোনো বাস নেই। ভাবছি হেঁটেই যাবো- সামান্য কিছু টাকাতো বাঁচবে। আমি একাই থাকি, তাই খুব অঙ্ক কষে প্রতিটা মাস পার করতে হয় আমার। ছয়মাস চাকরির জন্য খুব ছুটেছিলাম। কিন্তু পাঠক বুঝবে- এদেশে চাকরি পাওয়া খুব মুশকিলের ব্যাপার। চাকরি পেতেও অনেক টাকার দরকার হয়- কোথায় পাবো..! বাবার সাথে তো থাকি না, অসুস্থ লাগে। বিজয় সরণির একটা মেসে ভাড়া থাকি। শুধু রাতে একবেলা খাবার দেয়- পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া দেই। সারাদিনে দুইটা ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলে পড়াই আট হাজার টাকা পাই। পাঁচ হাজার ভাড়া দিয়ে আরো তিন হাজার আমার কাছে থাকে। সারা মাসে নিজের খরচ এক হাজার রেখে বাকি দুই হাজার জমাই। ভালো কিছু টাকা জমলে ছোটো খাটো কিছু করার চেষ্টা করবো। এখন তো শীতকাল। গাছগুলোর চেহারাও কেমন বিমর্ষ হয়ে আছে, শীতকালে কি সব রুক্ষ হয়ে যায়..!? পাতাগুলো নোংরা ধূসর হয়ে আছে। আমি হাঁটছি… আর ভাবছি… মাথার ভেতর হরেক চিন্তার স্রোত বয়ে যাচ্ছে..
এরপর হাঁটতে হাঁটতে আহির চন্দ্রিমা উদ্যানে পৌঁছেছে। কী মনে করে কিছু না ভেবেই ভেতরে ঢুকে একটা বেঞ্চে বসে পড়লো। দোকান থেকে একটা বন আর ড্যানিসের কৌটায় চা নিয়ে ঢুকেছিলো। ওকে দেখলে কেউ এখন আর বিশ্বাস করতে চাইবে না ওর বাবা যে বিশাল সম্পত্তির মালিক। অবশ্য সেদিকে তার কখনোই তেমন গুরুত্ব ছিলো না, বড়ই তো হলো জঞ্জালের ভেতর- বুঝবে কি করে। আহির তার চারপাশ টা দেখছে। একটা কাঠবিড়ালী লাফিয়ে মাটি থেকে কড়ই গাছে উঠছে, খুব কাছেই কোথাও আবার একটা কোকিল ডাকছে। দূপুরের রোদ গাছের পাতা ছুঁয়ে মাটিতে ছাপ ফেলছে- সে রুটিতে কামড় দিলো। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝে সে আবার হারিয়ে গেলো। মানুষ কতো আজব প্রাণী..! কতো রং কতো রূপ তাদের..! অথচ কৃত্রিম নয়- এই-ই মৌলিক। এক সময় ওরা ভালোবাসে, ভালোবাসতে সব বিসর্জন দিয়ে দেয়- মরেও যেতে নেয় উন্মাদ হয়ে। সময় গড়ালে আবার কেমন অপরিচিত হয়ে যায়। এক সময় আর ভালো লাগতে চায় না- বিভৎস লাগে। এমন কেন ছিলো মানুষের হিসাব..! প্রকৃতি মানুষকে কেন পশুর মতোও বোধ দিতে পারলো না..! দিয়েছে কি..!? তবে ভালোও আছে। কিন্তু এতই সামান্য যে চোখে পড়ে না। ওরা স্রোতের উল্টো দিকে সাঁতার কাটে- চিনবে কীভাবে..! রংধনুর সাতটা রঙের মতো মানুষেরও সাতটা অদৃশ্য রঙ থাকা প্রয়োজন ছিলো। ভালো মানুষ ধূসর রঙ, খারাপ মানুষ লাল, ভালো খারাপ মিশ্রিত মানুষ কালচে কমলা। ভন্ড মানুষের মাথা লাল, হাত-পা নীল, পেট হলুদ। আর যারা ঘনঘন রঙ পালটায় তাদেরকে সকালে দেখা যেতো সবুজ রঙে, বিকালে গাঢ় টিয়া, রাতে কুচকুচে কালো। বোকা মানুষগুলো তখন আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঠকতো না, আফসোস করে বলতো;- আহা! মানুষটা সকালেও আসমানী ছিলো, এখন লাল হয়ে গিয়েছে… টকটকে লাল…!
পাশেই ঝিঁঝি পোকার ডাকে কান ঝি ঝি ধরে গিয়েছা। স্তব্ধতার মাঝে ঝিঁঝিঁ আর ঘুঘুর ডাকে চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। আহির গায়ের শালটা সারা শরীরের উপর দিয়ে বেঞ্চেই শুয়ে পড়লো- আর সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমের ভেতর এক অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন দেখলো। একটি পাহাড়ী মেয়ে পাহাড় বেয়ে তার দিকে আসছে। মেয়েটি দেখতে পৃথিবীর কারো মতো নয়- প্রাচীন গ্রীসের দেবতাদের মতো। তার হাত ধরে নিয়ে চলছে পাহাড়ের চূড়ায়। পাহাড়ের কোনায় যখন ওরা বসেছে তখন সন্ধ্যার কমলা রেখা ছড়িয়ে গিয়েছে সারা দিগন্ত জুড়ে। পুরো পৃথিবী এখন কমলা রঙের একটা ছবি হয়ে আছে। পাহাড়ের উপর ভারি বাতাসে মেয়েটার চুল এলোমেলোভাবে উড়ছে- আর আহির অনুভুতিহীন তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঘুমের ভেতর আহিরের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি এলো- আর পৃথিবীতে তখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো..
চলবে….

Comments