Story

মেঘের মানচিত্র-৩

আমার মায়ের মৃত্যুটা ছিলো ভয়ানক অস্বাভাবিক। মেনে না নেয়ার মতো এক পরিণতি ঘটেছিলো তার সাথে। বাবার সাথে মায়ের ডিভোর্সের পর টানা আট বছর মা তার নিজের মগজের সাথে লড়াই করেছিলেন। প্রথম তিন বছর কিছুটা স্বাভাবিকও ছিলেন, কথা বলতেন, হাসতেন। আমার সাথে দেখা করতেন। আমিও থাকতাম মাঝে মাঝে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিন বছর পর ক্রমাগতই মগজের মরিচায় আক্রান্ত হতে থাকলেন। মানুষের ব্রেইন, তার স্মৃতি যে কতো আত্মঘাতীও হয় মায়ের মৃত্যুর ঘটনা তা আপনাদের কাছে পৌঁছে দেবে। তিন বছর পর থেকে মা পাগল হতে থাকলেন। আপন বলতে তো আমিই ছিলাম। আমাকেও সময় দিতেন না, কথা বলতেন না। আমি কোনোদিন বেড়াতে গেলে দেখতাম রুমের বড় জানালাটার পাশে একা বসে বাইরে তাকিয়ে আছেন। কেমন বিড়বিড় করতেন একটু পরপর। তারপর হঠাৎই যখন আমার দিকে চোখ যেতো বলতো, “কিরে আহির না..! কখন এলি দেখতেই পেলাম না..” অথচ তিনিই অন্যমনস্ক বিড়বিড় করে দরজা খুলে দিতেন ভেতরে ঢোকার। টানা পাঁচ বছর তিনি ভয়ানক ভাবে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে ছিলেন। কয়েকবার আমাকে নিয়ে মন ও মানসিক ডাক্তার মোহিত কামালের ট্রিটমেন্টও নিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসার চেয়ে যখন রোগের শক্তি বেশি হয়, তখন আর প্রতিকার প্রতিরোধের আশঙ্কা থাকে না। মা ফ্ল্যাটে একলা থাকতেন। তার কোনো মানুষের প্রয়োজন ছিলো না। মূলত মানুষকে তিনি ভয় পেতেন। ভাবতেন ওরা সবাই মাকে খুন করবে।

একদিনের ঘটনা- মা প্রতিমাসের বাজার একবারে কিনে আনেন যেন বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন না পড়ে। সেদিনও মা বাজারে গেলেন। কিন্তু একটু পরপর ভয়ে রাস্তার পথচারীদের দিকে তাকাচ্ছিলেন। দ্রুত হেঁটে রাস্তার জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছে যখন দাঁড়ালেন, তখন তার পৃথিবী বদলাতে লাগলো। তার মনে হতে থাকলো পথের সব মানুষ তাকে খুন করতে আসছে…! আশপাশ ঝাপসা হয়ে বাতাসের বিকট শব্দ শুনতে থাকলো। মনে হলো রাস্তার গাড়ি রিকশাগুলো এলোপাথাড়ি ভুলভাল পথে চলছে.! মনে হলো সবাই ক্রমাগত আত্মহত্যার দিকে আগাচ্ছে..! ঠিক কিছু বাদেই হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেলো। গাড়ি, বাতাস বা লোকজনের কোনো শব্দই আসছে না..! তিনি মুষড়ে গেলেন। মগজের ভিতর একটা চিকন চিননন শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ পেলেন না… হঠাৎ তিনি পেছনে ঘুরে পেছনের লোকটাকে নিচু স্বরে বললেন- “আপনি আমাকে ফলো করছেন..!?” লোকটা অবাক হলো এবং অস্বীকার করলো। তারপর মা চেঁচালেন- “হ্যাঁ আপনিই তো..! আপনিই আমাকে আধ ঘন্টা ধরে ফলো করছেন..! আপনার পকেটে একটা ছুরি আছে..! দেখুন আপনারা- এই লোকটা আধ ঘন্টা ধরে আমাকে মেরে ফেলার জন্য পিছু নিচ্ছে..! ওনাকে আমার স্বামী পাঠিয়েছে.. আপনারা আমাকে বাঁচান..! পুলিশ ডাকেন…!” চেঁচাতে চেঁচাতে মা রাস্তার পিচে শুয়ে পড়লেন.. মৃগী রোগীর মতো, জবাই দেয়া মুরগীর মতো রাস্তার মাটিতে দাপাতে লাগলেন।

পুলিশ এলো। লোকটাকে সার্চ করলো। লোকটা বললো তিনি ওনাকে চেনেন না। রাস্তার মানুষ সব বললো মা মানসিক রোগে আক্রান্ত, তাকে হাসপাতালে নেয়া হলো। হাসপাতাল থেকে আমাকে খোঁজ করা হলো, আমি গেলাম। দেখলাম জানালার পাশের বিছানায় মা ঘুমিয়ে আছেন একটা বাচ্চা শিশুর মতো। ঠিক যেমন আমিও ছিলাম, আর হয়তো মা-ও তখন আমায় দেখেন এই কথাটাই ভাবতো। সূর্যের আলো হালকা তাপে মায়ের আঙুল ছুঁয়েছে, আমি দরজার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম অনেক সময়… ‌সময়ের সাথে সাথেই আমি সময়ের প্রতিটা পরিবর্তনকে সহজ ভাবে শিখেছি- যদিও এরা ছিলো চরম নিষ্ঠুর ও দূর্ভোগের প্রতীক। আমি শিখতে বাধ্য হয়েছি। মানুষ বলে সময় সব ঠিক করে দেয়। হয়তো করে, কিন্তু তার নিজের পন্থায়। সময় কেবল সাহায্য করে জীবনের প্রচন্ড চাপ সহ্য করতে, ধীরে ধীরে তা সয়ে যায়। মায়ের রোগের পর থেকে তিনি প্রায়ই অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। কখনো আমাকে চিনতেন- বেশিরভাগই চিনতেন না। আমি আতঙ্কে ভয়ে থাকতাম কখন আমাকে চিনতে ভুল করে- কিন্তু আমারতো মা! ছোট থেকে এতোকাল বেড়েছি মায়ের স্নেহে যত্নে তা কি আমি ভুলে গিয়েছি! আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যতই মাথা খারাপ হোক- মা যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাকে চিনবেন। কিন্তু চিনতেন না। আর যখন চিনতেন না তখন মা মেরেও ফেলতে পারতেন।

‌এরপর দুবছর আগে একদিন- ‌মা সারা মাসের বাজার একদিনে কিনে তার ফ্ল্যাটে যান। মানুষের কাছে শোনা তখন নাকি তিনি স্বাভাবিকই ছিলেন। কিন্তু সেদিন রাতেই মা সিলিংয়ে শাড়ি পেঁচিয়ে ফাঁস নেন। আমি আজও প্রায়ই ভাবি, ফাঁস নেবার পূর্ব মুহুর্তে কী ছিলো তার চিন্তা-ভাবনা! কোন চিন্তাটা ছিলো তার ফাঁস নেবার কারণ! কী করে জানবো! প্রতিটা দরজা জানালার লক ভেতর থেকে লাগানো ছিলো। পনেরোদিন মায়ের লাশ ওই অবস্থায় ঝুলে ছিলো।

পাশের ফ্ল্যাটের মানুষেরা অনেকদিন লক্ষ্য করলো মা ঘর থেকে বের হচ্ছেনা। তারা সন্দেহ করলো। তালা ভেঙে যখন ভেতরে ঢুকলো, দেখতে পেলো মা ফাঁসিতে ঝুলে আছেন আর সারা ঘরভর্তি বিভৎস চামড়া পচা গন্ধ। আমাদের খোঁজ দেয়া হলো তখনই। আমি সাথে সাথেই ছুটলাম.. সারা রাস্তায় আমার মাথা পোকা ঢোকার মতো ভনভন করছিলো, আর আমি একটু পরপর চিৎকার করে কেঁদে উঠছিলাম…! ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমার চোখ বড় হয়ে এলো, আর কাঁদতে পারলাম না। আমার মা একটা মেক্সি পড়ে ঝুলে আছেন। আর যে শাড়িটায় ফাঁস দিয়েছেন ওটা বাবার দেয়া অনেক আগের একটা পছন্দের শাড়ি। সারা রুমে বিকট ঝাঁঝালো গন্ধ। ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছিলো, আরো অনেক অপরিচিত মানুষ ছিলো। আমি কাছে গেলাম আরও। লাশটার মাংস খসে পড়ছিলো পনেরো দিনের বাতাসের চাপে। চোখগুলো ছিলো অত্যন্ত ভয়ানক রকম খোলা আর কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে আসছিলো তার মনি। লাশের নিচে মল- রক্ত নাড়িভুঁড়ি পড়ে ছিলো। আমি একপাশের দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে বসে পড়লাম। বারবার মূর্ছে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিলো আমার। পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটি আমাকে ধরে অন্য রুমে নিয়ে গেলো। দেখলাম ড্রয়িং রুমের সোফায় আমার ছোটবেলার জামা জুতো খেলনাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নিশ্চয়ই মা মারা যাবার দিন সেগুলো বের করেছিলেন। মেয়েটা একটা খোলা ডায়েরি আমার কাছে নিয়ে এলো। সেখানে অনেক খাপছাড়া লাইন আমার চোখে পড়লো। বেশিরভাগ লেখা ছিলো তাকে কেউ মেরে ফেলবে এমন এবং শেষ দিনের লেখা ছিলো এমন- “আমি জানি তুমি আসবে.. এবং এতোদিনে তুমি জানবে সত্য কি.. আমি তোমাকে দূরে সরাতে চাইনি। এখন তুমি আমার আরও কাছে থাকবে..” আমি আর পারলাম না.. মাংসের বিকট গন্ধে- ভয়ে- আর চঞ্চল হযবরল চিন্তায় আমি জ্ঞান হারালাম আর দুদিন পর যখন ফিরলো তখন শুনলাম মাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আমার জ্ঞান ফিরছিলো না দেখে পাশের ফ্ল্যাটের ওরাই তাদের বাসায় আমাকে রেখেছিলো। শুনেছিলাম বাবাকে খবর দেয়া হয়েছিলো কিন্তু তিনি আসেনি।

হায় মানুষ.. হায় মানুষের সম্পর্ক.. হায় পরিবর্তনশীল মোহ… মা যখন বেঁচে ছিলেন তখনও আমার একটা শেষ ভরসা ছিলো। কিন্ত চলে যাবার পর আমার জীবনে কেবল আমিই রয়ে গেলাম। এখন বুঝি, যে নিঃসঙ্গতার নিস্তারের জন্য মা মুক্তি নিয়েছেন, আমিও সে পথে হাঁটছি.. এবং চিরকালই হাঁটবো বিরামহীন পৃথিবীর সব অলিগলিতে…

সমাপ্তি

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!