আঁধারের গল্প (১)
এপ্রিলের সময় সেটা। বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। ধানমন্ডির এক বাসার তিনতলার ফ্ল্যাটে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কারেন্ট চলে গিয়েছে বেশ আগেই। তবুও ঘরে আলো জ্বালায়নি কেউ। বাইরে থেকে তাই মনে হতে পারে ভেতরে কেউ নেই। এরকম ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে এক মেয়ে এসে সামনের দিকের বারান্দার গ্রিল দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। বৃষ্টির ছাট এসে লাগে তার চোখেমুখে। ভেজা হাত দুটো এনে গাল স্পর্শ করে। জোরে বাতাস আসতেই বৃষ্টির ভারী ফোঁটা তাকে ভিজিয়ে দেয় অনেকখানি। মুখে ছিটকে লাগা জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। তার চোখের বৃষ্টিও তখন আর বাধ মানে না। একই ধারায় প্রবাহিত হয়ে মিশে যায় বৃষ্টির জলে। হঠাৎই সে দুর্বল বোধ করে। কীসের এক যাতনা যেন তাকে কাবু করে নিতে চাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলতে শুরু করে সে। তাই কোনোরকমে হেঁটে বারান্দার এক কোণায় ভেজা মেঝেতেই বসে পড়ে। শীতে গা কাঁপতে থাকে তার। ক্ষতের স্হানগুলোয় প্রচণ্ড জ্বালাবোধ হতে থাকে। ষোল বছরের ফুটফুটে সেই কিশোরীর নাম মাধুরী। বাবা-মায়ের খুব শখ করে রাখা নাম। প্রথম সন্তান, অনেক আদরের। উজানপুর গ্রামে তার জন্ম । মেয়ে জন্মেছে শুনেই গ্রামের ঠোঁটকাটা লোকজন কানাঘুষা করতে থাকে। এমনকি তার দাদী পর্যন্ত মাধুরীর মাকে বলে যে, মেয়ে জন্ম দেয়ার চেয়ে তার মরে যাওয়াই ভালো ছিলো। তার বাবা মা অবশ্য তাকে নিয়েই খুশি ছিলো। হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও তাকে পড়াশোনা করাতে চেয়েছে। এ নিয়ে বেশ দ্বন্দও হয়েছে। “মেয়েমানুষের পড়াশোনার দরকার কী, পড়ালেখা করালে মেয়ে খারাপ হয়ে যাবে” ইত্যাদি নানা অপ্রীতিকর কথা শোনার পরও সবার বিপক্ষে যেয়ে মেয়েকে শিক্ষিত করতে চেয়েছে। সে কথা ভাবলে এখনও মাধুরীর মন কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। তার স্বপ্ন ছিলো পড়ালেখা করে সে অনেক বড় হবে। ঢাকার এক ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। এরপর চাকরি হলে বাবা মা আর ছোট ভাইটাকে ঢাকায় নিয়ে যাবে। বাবাকে আর রোদে ঘেমেনেয়ে প্রতিদিন ওভাবে ক্ষেতে কাজ করতে দিবে না। কিন্তু সেসব স্বপ্ন ততদিনে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। সে আর তখন স্বপ্ন দেখে না। কারণ তার মনে হতো স্বপ্নগুলো শুধু হাতছানিই দিয়ে যাবে। পূরণ হওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে তখন সবে মাত্র ক্লাস টেনে উঠেছে। প্রাণবন্ত, উচ্ছল এক মেয়ে। লম্বা ফ্রক গায়ে, লাল ফিতে দিয়ে দুই বিনুনি বেঁধে রোজ স্কুলে যেতো এক মাইল পথ হেঁটে। দুপুর নাগাদ ক্লাস শেষ হয়ে গেলে বন্ধুদের সঙ্গে কানামাছি, গোল্লাছুট খেলা তার নিত্যদিনের রুটিন ছিলো। দেরি হওয়ায় মায়ের বকুনিটাও বাদ যেতো না কখনো। বকুনি খেয়েও দমে যেতো না সে। বরং, মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ভালো মেয়ের মতো ক্ষমা চাইতো। মেয়ের নিষ্পাপ চেহারায় মায়াবী চোখ দুটো দেখেই বিগলিত হয়ে যেতেন মা। তাগাদা দিতেন গরম ভাত আর আলু ভর্তা দিয়ে দু মুঠো খেয়ে নিতে। একদিকে মায়ের অফুরান ভালোবাসা আর বাবার কাছে যত আবদার করতো মাধুরী। ঘর্মাক্ত বাবা যখন সন্ধ্যা নাগাদ ঘরে ফিরতেন, পরদিন দোকানে নিয়ে খেলনা কিংবা চিপস কিনে দেবার আবদার জুড়ে দিতো সে। বাবা ক্লান্ত হাসি দিয়ে আবদার মেনে নিতেন। এভাবেই কাটছিলো সময়… কিন্তু হঠাৎ তার এই ছোট্ট জীবনেই নেমে এলো ঘোর বিপদ। সে একদিন স্কুলে যাচ্ছিলো। পাগলি বাড়ির জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাবার সময় গ্রামের মাতবরের ছেলে তার পথ আগলে দাঁড়ায়। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে মাধুরীর। এমনিতেই ভয়ানক গুন্ডা হিসেবে পরিচিতি আছে ছেলেটির। লোকমুখে শোনা যায়, সে নাকি দুই তিনটে খুনও করেছে। তার ওপর চেহারায় কেমন যেন একটা হিংস্র ছাপ। মাধুরী কোনোরকমে বলে ওঠে, “কিছু বলবেন, ভাইজান?” লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানো মিনহাজ বলে, “তুই অনেক সুন্দর হইয়া গেছোস রে মাধুরী! আমারে বিয়া করবি?” কথাগুলো শুনে আতঙ্কে মাধুরীর বুকে কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। সে কোনোরকমে ঢোঁক গিলে বলে, “এসব কী বলতেছেন ভাইজান? আমি আপনের বইনের মতো। আর আমি তো এহনও অনেক ছোট।” “ছোট বড়তে কিছু হইবো না মাধুরী। তোরে আমার মনে ধরছে। তোরেই বিয়া করুম।” সেদিন কোনোরকমে ছুটে পালিয়েছিলো মাধুরী। চিন্তা করবে বলে মা-বাবাকে কিছু জানায়নি সে। কিন্তু মিনহাজের উৎপাত দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। একদিন তো রীতিমতো হাত ধরে টেনে নিতে চাচ্ছিলো জঙ্গলে। বাড়ির পাশের সালেহ্ চাচা দেখতে পেয়ে বাঁচায় সেদিন। তখন আর বাড়িতে জানতে বাকি থাকে না। মা-বাবা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কিছুদিনের জন্যে মাধুরীর বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ওদিকে মাতবরের ছেলেও অত সহজে দমবার নয়। মাতবরকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় মাধুরীর বাড়িতে। কিন্তু মাধুরীর বাবা এক কথায় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেন। মেয়ের বয়স অল্প হলেও সে রাজি হতো। কেননা, ওদিকটায় ওই বয়সী মেয়ের অহরহ বিয়ে হয়। কিন্তু তাই বলে মিনহাজের মতো এক সন্ত্রাসীর হাতে তো মেয়েকে তুলে দিতে পারে না! সে সাফ মানা করে দেয় সেই প্রস্তাবে। কিন্তু ছেলের চেয়ে বাবাও নেহাৎ কম ভয়ানক নয়। মাধুরীর বাবাকে মাতবর শাসিয়ে যায় মেয়েকে দেখে নিবে বলে!
এই হুমকির পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা মাধুরীর পরিবারের অজ্ঞাত নয়। তাই দেরি না করে সেদিন রাতেই এক নৌকা ভাড়া করে মাধুরীকে পাশের গ্রামে তার খালার বাড়িতে রেখে আসা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তাকে নিয়ে আসবে ভেবেছিলো। কিন্তু, মাধুরীকে না পেয়ে মাতবরের ছেলে এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠে যে, খোঁজ খবর নিয়ে মাধুরীর খালার বাড়ি অব্দি পৌঁছে যায় এবং তাকে তুলে নিয়ে যাবে বলে হুমকি দেয়। এই বেসামাল পরিস্হিতিতে মাধুরীর খালা এক উপায় বের করে। তাদের গ্রামের আজহার মোল্লার ছেলে রফিক মোল্লার সাথে মাধুরীর বিয়ে ঠিক করে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। বেঁটে এবং কালো হলেও অঢেল টাকা-পয়সার মালিক সে। আট বছর কুয়েতে ছিলো। এখন ঢাকায় বাড়ি কিনেছে। বিয়ের পর মাধুরীকে ওখানে নিয়েই রাখবে। বছর খানেক আগে দেশে এসে একবার দেখেছিলো মাধুরীকে। তখনই বিয়ের জন্যে বলেছিলো। তবে মাধুরীর জেদে সেটা আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু এবার এই নেতিবাচক পরিস্হিতিতে পরিবারের লোকদের সরল আকুতিতে মাধুরীর বাধ্য হয়ে মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। ফলে বিয়ে হয়ে যায় বাবার বয়সী একজন লোকের সাথে। তারা ঢাকায় চলে আসে। পনের বছর বয়সী একটা বাচ্চা মেয়ে পরিস্হিতির শিকার হয়ে নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করে। মানিয়ে নিতে চায় এত দায়িত্বের ভিড়ে। সারাদিন ঘরের কাজ করেই কেটে যায়। তার স্বামীকে অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও কলেজে ভর্তি করায়নি। ভাগ্যকে মেনে নিয়েই তাই সংসারে মনোনিবেশ করতে চায় সে। প্রথম প্রথম তার স্বামী তাকে ভালোবাসা, যত্নে ভরিয়ে রাখলেও চার মাস গড়াতে না গড়াতেই কেমন যেন হয়ে ওঠে সে। ভালোবাসা ধীরে ধীরে পশুত্বে পরিণত হয়। সারাদিন কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পর রূঢ় আচরণ করে সে। খাবার ভালো হয়নি বলে মুখে ছুঁড়ে মারে। সারাদিনের হাজারটা কথা যে জমিয়ে রেখেছে নিজের ভেতর, কাউকে বলার তাড়নায় ছটফট করেছে, সেই কথাগুলো নিজের ভেতরই হারিয়ে যায় মাধুরীর। প্রচণ্ড অসহায় অনুভব করে সে। সারাদিনের কাজ সামলানোর পর অতটুকুন ক্লান্ত দেহটা যখন বিছানায় এলিয়ে পড়ে, তখন সেই মানুষটা হিংস্র পশুর মতো মাধুরীর শরীর খুবলে খায়। বিন্দুমাত্র ভালোবাসা কিংবা আবেগ থাকে না সেখানে।
এতসব কিছুর পরেও মাধুরী মুখ বুঁজে সব মেনে নিচ্ছিলো। “স্বামীরা হয়তো এমনই হয়” এরূপ বদ্ধ ধারণা নিয়া সংসার করে যাচ্ছিলো। পড়ালেখার স্বপ্ন ততদিনে হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ যখন সেই ঝড়ের রাতে স্বামীর পরকীয়ার বিষয়টি তার সামনে এলো, সে আর ঠিক থাকতে পারেনি।
বেশ অনেকদিন যাবৎ মাধুরীর কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিলো। তার স্বামী অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে। মাঝেমাঝে তো ফেরেই না। কিছু জানতে চাইলে ধমক দেয়। আর বাসায় থাকলে মাধুরীকে আড়াল করে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলতে থাকে। সবকিছু মিলিয়েই কেমন যেন খটকা লাগে মাধুরীর। সেই রাতে রফিক বাথরুমে গোসল করছিলো। তখন তার ফোনে অবিরত কল আসতে থাকে। শেষে কী করবে বুঝতে না পেরে মাধুরী কল রিসিভ করে ফোন কানে নিতেই এক মেয়ে কণ্ঠস্বর বলে ওঠে, “আজ রাতে আসলে না যে! একা একা আর ভালো লাগছে না। সোহেল তো বেশ কদিনের জন্যে ঢাকার বাইরে গিয়েছে। তোমাকে ভীষণ দরকার।” কথাগুলো শুনতেই মাধুরীর পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যেতে থাকে। কোনোরকমে চেয়ার ধরে নিজেকে সামলে নিতে চায় সে। এর মধ্যেই তার স্বামী বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। মাধুরীর কানে ফোন দেখতেই টান দিয়ে সেটা নিয়ে নেয় সে। মাধুরীর চোখ ঘোলাটে হয়ে আসে। কিছু বুঝা ওঠার আগেই রফিক তার চুলের মুঠি ধরে টান দিয়ে গালে সজোরে এক চড় লাগায়। মাধুরী বিস্ময়আহত হয়ে তার দিকে তাকাতেই সে বলে ওঠে, “আমার ফোন ধরার এত সাহস তোরে কে দিছে! বেশি উড়া শুরু করছোস না? তোর পাখনা আমি ছিঁড়া দিমু।” মুহূর্তেই কী যেন হয়ে যায় মাধুরীর। এক ঝটকায় রফিককে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় সে। এতদিনের রাগ, ক্ষোভ, কষ্টের বহিঃপ্রকাশ হতে শুরু করে। চিৎকার করে সে বলতে থাকে, “আমারে সরল পাইয়া যে দিনের পর দিন অত্যাচার করতেছেন, হেইদিকে খেয়াল থাকে না আপনের! অহন আরেক বেটির লগে এসব কী শুরু করছেন! আমারে কি মানুষ মনে হয় না? আমার কী দোষ আছিলো? কী করি নাই আপনের জন্য? তারপরও এমনে কষ্ট দিতাছেন ক্যান!” মাধুরীর এসব মর্মস্পর্শী কথা যেন কানেই যায় না রফিকের। যাচ্ছেতাই ভাষায় গালি দিয়ে তাকে মারতে থাকে। তীব্র আর্তনাদ তার পাথুরে হৃদয় ভেদ করে না। একসময় মাধুরীকে এক কোণায় ফেলে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রফিক।
মাধুরী যখন সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বারান্দায় বসে ছিলো, তখনই সে ঠিক করে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। নরকের এই তীব্র দহন আর সইতে পারবে না সে। পরদিন ভোরেই সে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যায় পুনর্জন্মানো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে…
জাগতিক নিয়মই হচ্ছে, প্রচণ্ড খারাপ সময়ের পর ভালো সময় আসে। তেমনটাই হয়েছিলো মাধুরীর সাথে। পথে দেখা হয়েছিলো এনজিওর এক অমায়িক মহিলার সাথে। যার সাহায্যেই মাধুরীর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সে নতুন করে বাঁচতে শিখে। পৃথিবীর দূষিত বায়ু ছেড়ে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নেয় এখন। কলেজ পাশ করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্রী সে। নিজের পায়ে দাঁড়ানো মাধুরী আজ স্বপ্ন দেখে তার পরিবারকে স্বাবলম্বী করবার।

Comments